হাতে বানানো এই ঘি-ই আজকের সুপারফুড
রিফাইন্ড তেলের ঝকঝকে বিজ্ঞাপনের যুগে যেন আবারও ফিরে আসছে রান্নাঘরের পুরনো আস্থা। অনেকেই এখন ভরসা রাখছেন প্রাচীন খাদ্যাভ্যাসে। আর সেই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে এটু ঘি (A2 Ghee)। কেউ বলছেন 'লিকুইড গোল্ড' (Liquid Gold), কেউ বা ‘সুপারফুড’ (Superfood)।
আয়ুর্বেদের (Ayurved) প্রশংসা তো আছেই, তার সঙ্গে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের (Nutrition) সমর্থন—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই A2 ঘি-র জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল—A2 ঘি আর সাধারণ ঘিয়ের মধ্যে আসল পার্থক্য কোথায়? আর হঠাৎই বা এত চর্চা কেন?
A2 Ghee আসলে কী?
অন্য ঘিয়ের সঙ্গে এই ঘিয়ের মূল পার্থক্য লুকিয়ে আছে গরুর দুধে। A2 ঘি তৈরি হয় দেশি গরুর দুধ থেকে—যেমন গির, সাহিওয়াল, রাঠি প্রজাতি। এই দুধে থাকে শুধুমাত্র A2 বিটা-কেসিন প্রোটিন।
অন্যদিকে, বাজারে যে ঘি বেশি দেখা যায়, তা সাধারণত জার্সি বা হলস্টেইন জাতের গরুর দুধ থেকে তৈরি। সেখানে থাকে A1 বিটা-কেসিন প্রোটিন।
কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, A1 প্রোটিনের সঙ্গে টাইপ ১ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, এমনকি কিছু স্নায়ুবিক সমস্যার সম্ভাবনা জড়িত থাকতে পারে। সেই তুলনায় A2 প্রোটিন শরীরের পক্ষে তুলনামূলকভাবে ভাল বলে দাবি করা হয়।
A2 ঘিতে A1 প্রোটিন থাকে না। তাই এটি তুলনামূলকভাবে সহজপাচ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ—এমনটাই মত অনেক পুষ্টিবিদের।
৫ হাজার বছরের ‘বিলোনা’ পদ্ধতি
A2 ঘির বিশেষত্ব শুধু উপাদানে নয়, তার তৈরির প্রক্রিয়াতেও। এটি তৈরি হয় প্রাচীন ‘বিলোনা’ পদ্ধতিতে, যার ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের।
এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে দেশি গরুর দুধ ফুটিয়ে ঠান্ডা করা হয়। তারপর সেই দুধে দই মিশিয়ে সারারাত ফার্মেন্ট করা হয়। পরদিন কাঠের বিশেষ লাঠি দিয়ে, হাতে মন্থন করে, মাখন আলাদা করা হয়। শেষে সেই মাখন ধীরে ধীরে গরম করে তৈরি হয় ঘি।
এই ধীর, হাতে-কলমে প্রক্রিয়াই ঘিয়ের স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিগুণ অটুট রাখে। ফলে A2 ঘি হয়ে ওঠে আলাদা এবং খাঁটি।
কেন একে ‘সুপারফুড’ বলা হচ্ছে?
A2 ঘি কেবল ফ্যাট নয়, এটি একাধিক পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে—
-
ভিটামিন A, D, E ও K2
-
ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৯ ফ্যাটি অ্যাসিড
-
কনজুগেটেড লিনোলেইক অ্যাসিড (CLA), যা ফ্যাট মেটাবলিজমে সাহায্য করে
-
শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
এই সব উপাদান রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। অনেকের মতে, গর্ভবতী মহিলা, শিশু, অ্যাথলিট বা অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠা রোগীদের জন্য এটি উপকারী হতে পারে।
রান্নার জন্য A2 ঘি কি তেলের চেয়ে ভাল?
এই ঘির স্মোক পয়েন্ট প্রায় ২৫০°C। ফলে ডিপ ফ্রাই, হাই-হিট কুকিং, স্টির ফ্রাই, বেকিং বা রোস্টিং—সব ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার করা যায় নিরাপদে।
গরম করলেও অন্যান্য তেলের মতো সহজে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিকাল তৈরি হয় না, এই ঘি সম্পর্কে এমনটাই দাবি করা হয়।
ফার্মেন্টেশন পদ্ধতিতে তৈরি হওয়ায় এবং A1 প্রোটিন না থাকায় এটি পেটের জন্যও তুলনামূলকভাবে সহনীয়। গাট মাইক্রোবায়োম সাপোর্ট, হজমে সহায়তা এবং ফ্যাট-সলিউবল ভিটামিন শোষণে এটি কার্যকর বলে মত আয়ুর্বেদের।
যাঁরা দুধ বা ছানা সহজে হজম করতে পারেন না, তাঁদের অনেকেই A2 ঘি তুলনামূলকভাবে সহজে গ্রহণ করতে পারেন।
হার্ট, ত্বক ও চুলে প্রভাব
এতে থাকা তথাকথিত ‘গুড কোলেস্টেরল’ হৃদ্যন্ত্রের পক্ষে উপকারী বলে ধরা হয়। পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, ত্বকে স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য আনা, চুলের গঠন মজবুত করা এবং চুল পড়া কমাতেও এটি সহায়ক হতে পারে—এমন দাবি রয়েছে।
নকল থেকে সাবধান
চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে নিম্নমানের বা ভেজাল পণ্যও বেড়েছে। কেনার সময় নজর দিন—
-
গরুর জাত: গির, সাহিওয়াল, রাঠি প্রজাতির উল্লেখ আছে কিনা
-
প্রসেসিং পদ্ধতি: ‘বিলোনা’ লেখা আছে কিনা
-
টেক্সচার: আসল A2 ঘি জমে গেলে দানাদার হয়
-
গন্ধ: হালকা বাদামের গন্ধ থাকবে
-
ব্র্যান্ডের স্বচ্ছতা: গরুর উৎস, ফার্ম ও প্রস্তুত প্রক্রিয়া স্পষ্ট উল্লেখ আছে কিনা