কীভাবে বাছাই হয় ট্যাবলোর, কারা করে?
রাত পোহালেই সাধারণতন্ত্র দিবস। লালকেল্লায় কুচকাওয়াজের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজের পাশাপাশি যে অংশটি সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে, তা হল রাজ্য, কেন্দ্রীয় মন্ত্রক ও বিভিন্ন বিভাগের ঝলমলে ট্যাবলো (Tableaux)। রঙিন আলো, লোকশিল্প, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি আর ভাবনার মেলবন্ধনে এই ট্যাবলোগুলিই তুলে ধরে ভারতের বৈচিত্র্য ও অগ্রগতির ছবি। কিন্তু এই ট্যাবলো কীভাবে বাছা হয়, কারা ঠিক করেন কোনটা অংশ নেবে, কোনটা নয়, সেই প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘোরে।
চলতি বছর অর্থাৎ ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবস (77th Republic Day) উপলক্ষে মোট ৩০টি ট্যাবলো অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (States & Union Territories) এবং ১৩টি কেন্দ্রীয় মন্ত্রক (Ministries)। এ বছরের মূল ভাবনা—‘স্বতন্ত্রতা কা মন্ত্র: বন্দে মাতরম’ (Swatantrata ka Mantra: Vande Mataram) এবং ‘সমৃদ্ধি কা মন্ত্র: আত্মনির্ভর ভারত’ (Samriddhi ka Mantra: Aatmanirbhar Bharat)। এই থিমের মধ্য দিয়েই তুলে ধরা হচ্ছে জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’ (Vande Mataram)-এর ১৫০ বছরের ঐতিহ্য এবং আত্মনির্ভরতার পথে দেশের দ্রুত এগিয়ে চলার গল্প।
এই থিম নির্ধারণ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক (Ministry of Defence)। সাধারণতন্ত্র দিবসের সম্পূর্ণ আয়োজনের দায়িত্বে থাকা এই মন্ত্রক অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে থিম চূড়ান্ত করে। এরপর সেই থিম অনুযায়ী রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও বিভিন্ন মন্ত্রককে ট্যাবলোর প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক দেশের মোট ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রক, দফতর এমনকি নির্বাচন কমিশন (Election Commission) ও নীতি আয়োগকেও (NITI Aayog) আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায়।
ট্যাবলোর নকশায় সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা দফতরের নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস বা উন্নয়নের দিকটি তুলে ধরতেই হয়, তবে থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নির্দেশিকা অনুযায়ী ট্যাবলোতে থাকতে পারে আধুনিক ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে ওয়াল (Electronic Display Wall), রোবোটিক বা মেকাট্রনিক চলমান অংশ (Robotics/Mechatronics), থ্রি-ডি প্রিন্টিং (3D Printing), সৃজনশীল এলইডি আলো (LED Lighting), উন্নত সাউন্ড ব্যালান্স ও বিশেষ ভিজুয়াল ইফেক্ট। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার বাধ্যতামূলক—প্লাস্টিক সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কোনও দুটি রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ট্যাবলো যেন একরকম না হয়, সেদিকেও কড়া নজর রাখা হয়। লেখালেখি বা লোগো ব্যবহার করা যায় না, শুধুমাত্র রাজ্য বা দপ্তরের নাম—সামনে হিন্দিতে, পিছনে ইংরেজিতে এবং পাশে আঞ্চলিক ভাষায় লেখা থাকে।
এই প্রস্তাব বাছাইয়ের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রক গঠন করে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি (Expert Committee)। শিল্প, সংস্কৃতি, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, সঙ্গীত, স্থাপত্য ও কোরিওগ্রাফির মতো ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই কমিটিতে থাকেন। প্রথম ধাপে তাঁরা জমা পড়া স্কেচ বা ধারণা খতিয়ে দেখেন। প্রয়োজনে সংশোধনের পরামর্শও দেন। নকশা হতে হয় সহজ, রঙিন, চোখে পড়ার মতো এবং নিজেই নিজের কথা বলবে—অতিরিক্ত ব্যাখ্যার দরকার নেই।
যে ট্যাবলোতে নৃত্য পরিবেশনা থাকে, সেখানে অবশ্যই ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য, আসল পোশাক ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতে হয়। সেই সঙ্গে ভিডিও জমা দেওয়াও বাধ্যতামূলক। প্রাথমিক ছাড়পত্র পাওয়ার পর তৈরি হয় থ্রি-ডি মডেল, যা আবার কমিটির বিচারে যায়। একাধিক দফায়, প্রায় ছয় থেকে সাত রাউন্ড বৈঠকের পর ধাপে ধাপে ছাঁটাই হয় তালিকা। শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান আকর্ষণ, জনমানসে প্রভাব, থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য, খুঁটিনাটি কাজের মান ও সংগীত-সব মিলিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।