বনপুরার - মা সাতভউনি
ঝাড়গ্রাম জেলার সাঁকরাইল ব্লকের বনপুরা । প্রকৃতির কোলে ঘুমিয়ে থাকা এক শান্ত, সবুজ, গ্রাম। গ্রামের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বয়ে চলেছে ডুলুং নদী। ভোরের আলোয় নদীর পাড়ে দাঁড়ালে - বাতাসের গন্ধে যেন কোনও অদৃশ্য ইতিহাসের পাখসাট জানান দেয়। এই নদীর তীরেই, লতা-গুল্মে ঘেরা এক নিভৃতকুঞ্জে মা সাতভোউনির থান। গ্রামবাসীর বিশ্বাসে, তিনি শুধু দেবী নন—তিনি গ্রামের রক্ষাকর্ত্রী। ফি-বছর আষাঢ় মাসে আষাঢ়ী পূজা আর মাঘ মাসের পয়লায় মাঘি-মকর পূজাকে কেন্দ্র করে বনপুরায় মেলা বসে । দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন—পুষ্পাঞ্জলি দেন, মানত রাখেন, বরাভয় চান । লোককথা অনুযায়ী, বহু শতাব্দী আগে রাজত্ব করতেন রাজা রনজিৎ সিংহ। তাঁর সাত রানি। এক ভয়াবহ আক্রমণে রাজা নিহত হলে, আত্মসম্মান রক্ষায় সাত রানিই ডুলুং নদীতে আত্মবিসর্জন দেন।নদীর ঢেউয়ে মিলিয়ে যান তাঁরা,বছর পেরিয়ে একদিন, নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে একজন জলের তলা থেকে তুলে আনে রহস্যময় পাথরখণ্ড। সেই রাতেই স্বপ্ন আদেশ সাত নারীর। তাঁরা জানান—এই পাথরেই আছে তাঁদের একত্রিত রূপ। অনুরোধ করেন, চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে তা প্রতিষ্ঠা করার।পরদিন সেই পাথর প্রতিষ্ঠিত হয়। আর সেই থেকেই শুরু মা সাতভোউনির আরাধনা

প্রস্তর মূর্তির মুখ বনবিড়ালের মতো, আর দেহ নারীর রূপে। অদ্ভুত এই গঠনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে রহস্য আর আস্থার ইতিহাস । গ্রামবাসীরা বলেন, মা সাতভোউনি অত্যন্ত জাগ্রত। মন থেকে মানত করলে, দেবী ফেরান না কাউকে।তবে একটি নিয়ম আজও অপরিবর্তিত। পূজার শেষে বলির সময়, মেলার সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বাস—সেই মুহূর্তে মন্দির প্রাঙ্গণে মানুষের উপস্থিতি নিষেধ। বনপুরার মানুষ নিজেদের বিশ্বাস আর ঐতিহ্য আগলে রাখতে একজোট হয়েছেন। মন্দির সংস্কার, পথঘাট উন্নয়ন—সবটাই ভবিষ্যতের জন্য।নদীর কলতান, প্রকৃতির নৈসর্গিক নিস্তব্ধতা আর মানুষের বিশ্বাস—এই তিনেই মা সাতভোউনির সত্ত্বা। এক দেবী, এক ইতিহাস, আর বনপুরা গ্রামের প্রাণ।
