কোথা থেকে এল এই মারণ ভাইরাসের পরিচয়
পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাসের (Nipah Virus West Bengal) সম্ভাব্য সংক্রমণ ঘিরে যখন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন, এই ভয়ংকর ভাইরাসের নাম ‘নিপা’ কেন? কোথা থেকেই বা এল এই নাম?
সোমবার নদিয়ার কল্যাণী এইমসের ভাইরাস রিসার্চ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে দু’জন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে নিপা ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়েছে। দু’জনেই বর্তমানে চিকিৎসাধীন এবং তাঁদের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক বলে জানিয়েছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। আক্রান্তদের গতিবিধি ঘিরে উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান ও নদিয়া জেলায় শুরু হয়েছে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং।
এই পরিস্থিতিতে নিপা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি এই ভাইরাসের ইতিহাস জানা।
নিপার নামকরণ কীভাবে?
নিপা ভাইরাসের নাম এসেছে মালয়েশিয়ার ‘কাম্পুং সুংগাই নিপা’ (Kampung Sungai Nipah) নামের একটি গ্রাম থেকে।
১৯৯৮–৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথমবার এই ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। ওই সময় শুয়োরের খামারকে কেন্দ্র করে এক অজানা রোগ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং প্রাণ হারান। পরে গবেষণায় জানা যায়, ওই এলাকার কাছেই থাকা সুংগাই নিপা গ্রাম থেকেই সংক্রমণের সূত্র পাওয়া যায়। সেই কারণেই নতুন আবিষ্কৃত এই ভাইরাসের নাম রাখা হয় নিপা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসের নামকরণে প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়া এলাকার নাম ব্যবহারের চল বহু পুরনো। ইবোলা, জিকা কিংবা মারবুর্গ, সব ক্ষেত্রেই সেই ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়েছে।
নিপা ভাইরাস কী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, নিপা ভাইরাস একটি জুনোটিক সংক্রমণ, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এই ভাইরাস হেনিপাভাইরাস (Henipavirus) গোত্রভুক্ত।
এর প্রধান প্রাকৃতিক বাহক হল ফলখেকো বাদুড় বা ফ্রুট ব্যাট, বিশেষ করে Pteropodidae পরিবারভুক্ত বাদুড়। মালয়েশিয়ায় প্রথম সংক্রমণের সময় শূকর ছিল মধ্যবর্তী বাহক। পরে ভারত ও বাংলাদেশে দেখা গিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বাদুড়ের মাধ্যমেই মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।
নিপা ভাইরাসের উপসর্গ কী কী?
নিপা ভাইরাসের উপসর্গ শুরুতে সাধারণ ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো হওয়ায় অনেক সময় ধরা পড়ে দেরিতে।
প্রাথমিক উপসর্গ—
জ্বর
শরীর ব্যথা ও পেশিতে যন্ত্রণা
গলা ব্যথা
শ্বাসকষ্ট
সংক্রমণ গুরুতর হলে দেখা দিতে পারে—
- তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা
- খিঁচুনি
- বিভ্রান্তি ও অচেতনতা
- মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)
- চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, কোনও কোনও ক্ষেত্রে উপসর্গ না থাকলেও ব্যক্তি সংক্রমণের বাহক হয়ে উঠতে পারেন—এটাই নিপা ভাইরাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক।
কীভাবে নিপা শনাক্ত করা হয়?
নিপা ভাইরাসকে বায়োসেফটি লেভেল–৪ (BSL-4) শ্রেণির ভাইরাস হিসেবে ধরা হয়। তাই শুধুমাত্র বিশেষ সুরক্ষিত ল্যাবরেটরিতেই এর পরীক্ষা সম্ভব। পরীক্ষার পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে—
- রক্তে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা
- টিস্যুর হিস্টোপ্যাথলজি
- PCR ও RT-PCR
- ELISA ও Serum Neutralization Test
চিকিৎসা কতটা কার্যকর?
বর্তমানে মানুষের বা পশুর জন্য নিপা ভাইরাসের কোনও নির্দিষ্ট টিকা নেই। চিকিৎসার মূল ভরসা ইনটেনসিভ সাপোর্টিভ কেয়ার এবং সম্পূর্ণ আইসোলেশন।
কেরলের অভিজ্ঞতা বলছে, ২০১৮ সালে প্রথম নিপা সংক্রমণে মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৯১ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলিতে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ (যেমন রেমডেসিভির) ব্যবহারের ফলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। ২০২৩ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৩৩ শতাংশে। ২০২৫ সালেও দ্রুত চিকিৎসার ফলে একাধিক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।